কবুতর পালন- অল্প পুঁজিতে লাভজনক ব্যবসা

অনেকে শখ করে কবুতর পালন করে, অনেকে বিক্রি করেন অল্প পুজিতে লাভজনক ব্যবসা করার জন্য। কম টাকায় ব্যবসা করার মাধ্যম হিসেবে কবুতর পালন এক সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হচ্ছে। অনেকেই কবুতর পালনের নিয়ম কানুন জানতে চান। নিচে কবুতর পালনের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

কবুতর সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় বাসা বাঁধে। প্রতি জোড়ায় একটি পুরুষ কবুতর এবং একটি স্ত্রী কবুতর থাকে। এরা গড়ে ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। যত দিন বাঁচে, ততো দিন কবুতর ডিমের মাধ্যমে বাচ্চা দেয়। ডিম পাড়ার পর স্ত্রী ও পরুষ উভয় কবুতরই পালা করে ডিমে তা দেয়।

কবুতরের জোড় যদি কখনো ভেঙ্গে যায়, আবার জোড়া মিলাতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। নতুন জোড়া মিলানোর জন্য স্ত্রী ও পরুষ কবুতরকে কিছুদিন একঘরে রাখতে হয়। কুমিল্লার কবুতর ব্যবসায়ী মহিদুল ইসলাম রিন্তু জানান, পর্যাপ্ত সূর্যের আলো এবং বাতাস চলাচল আছে এরকম উঁচু জায়গায় কবুতরের খোপ করতে হবে। মাটি থেকে ঘরের উচ্চতা ২০ থেকে ২৪ ফুট এবং কবুতরের খোপের উচ্চতা ৮ থেকে ১০ ফুট হওয়া ভালো। একটি খামারে কবুতর পালন করার জন্য ৩০ থেকে ৪০ জোড়া কবুতর আদর্শ। কবুতরের খোপ দুই বা তিন তলাবিশিষ্ট করা যায়। কাঠ, টিন, বাঁশ, খড় ইত্যাদি দিয়ে সহজে ঘর তৈরি করা যায়। কবুতরের খোপের বাইরে বা খামারের ভিতর নরম, শুষ্ক খড়কুটা রেখে দিলে তারা ঠোঁটে করে নিয়ে নিজেরাই বাসা তৈরি করে নেয়। ডিম পাড়ার সময় খোপে খড়, শুকনো ঘাস, কচি ঘাসের ডগা জাতীয় উপাদান দরকার হয়।

খাবার দাবার

গম, মটর, খেসারি ভুট্টা, সরিষা, যব,চাল, ধান, কলাই ইত্যাদি শস্যদানা কবুতর খেয়ে থাকে। প্রতিটি কবুতর দৈনিক প্রায় ৩০-৫০ গ্রাম খাবার খায়। কবুতরের জাত ভেদে কবুতরের খাবারও ভিন্ন ভিন্ন। গোলা প্রজাতির কবুতর সাধারণত সব ধরনের শস্যদানা খায়। আর গিরিবাজ কবুতর খায় ধান, গম, সরিষা, তিসি, ভুট্টা, কুসুম, ফুলের বিচি ইত্যাদি।

ফেন্সি কবুতরের খাবার ডাবলি বুট, গম, সূর্যমূখীর বিচি, কুসুম ফুলের বিচি ইত্যাদি। বাদাম, ডাবলি বুট, ছোলা বুট, ফুলের বিচি, তিসি, বাজরা, চিনা, মুগডাল, মাষকলাই, মসুর, হেলেন ডাল ইত্যাদি হোমাররে খাবার।

কবুতরের প্রজনন

কবুতর সাধারণত ছয় মাস বয়সে ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে ১৭ থেকে ১৮ দিন এবং বাচ্চার এক মাস বয়সেই মা কবুতর আবার ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর থেকে বাচ্চাকে খাবার খাওয়ানো থেকে শুরু করে সব ধরনের যত্ন মা কবুতর করে। ১৫ দিন থেকে এক মাস বয়সী বাচ্চা বাজারে বিক্রি করা যায়। রেসের কবুতরকে বাচ্চা বয়স থেকেই আলাদাভাবে যত্ন নিতে হয়। কবুতরটির বয়স দুই থেকে তিন মাস হলেই পরিবার থেকে আলাদা করে ভিন্ন খাঁচায় রাখা হয়। চার মাস বয়স হলে আবারো কবুতরের খাচা পরিবর্তন করতে হয়। এবার কবুতরের খাচা থাকে ঘরের বাইরে। ছয় মাস বয়সে বাসস্থানের আশে পাশে সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওড়ার প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। এভাবে রেসার কবুতর উড়তে শিখে। ধীরে ধীরে ওড়ার বেগ ও দূরত্ব বাড়তে। আমাদের দেশে গোলা, গিরিবাজ, হোমার এবং ফেন্সি প্রজাতির কবুতর বেশি পালা হয়। গোলা প্রজাতির কবুতর বেশি পালা হয়।

গোলা প্রজাতির কবুতর বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রির জন্য পালন করা হয়। গিরিবাজ প্রজাতির মধ্যে সবুজ গোলা, গরবা, মুসলদম, কালদম, বাগা, চুইনা, লাল চিলা, খয়েরি চিলা ইত্যাদি উল্যেখযোগ্য। গিরিবাজ ও হোমার প্রতিযোগিতার জন্য বিখ্যাত। ফেন্সি বা শৈখিন প্রজাতির কবুতরের মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যা, প্রিন্স, বল, সুয়া চন্দন, সুইট, কিং সিরাজি, নোটন পায়রা ইত্যাদি। প্রতি জোড়া দেশি গোলা ২০০ থেকে ৬০০, বোম্বাই গোলা ৫০০ থেকে ১০০০, মুসলদম ৮০০ থেকে ১০০০, কালদম ১০০০ থেকে ১৬০০, বাগা ৮০০ থেকে ১০০০, লক্ষ্যা ২০০০ থেকে ২৫০০, প্রিন্স ১৫০০ থেকে ৩০০০, হোমার প্রজাতির কবুতর ৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

কোথায় পাবেন

প্রতি শুক্রবার গুলিস্তানের কাপ্তান বাজারে কবুতর, কবুতরের খাঁচা বা কবুতরের খোপ এবং কবুতরের খাবারের বিশাল হাট বসে। এখানে দেশি বিদেশি প্রায় সব ধরনের কবুতর পাওয়া যায়। এছাড়া জিঞ্জিরায় শুক্রবার, পাগলায় শনিবার হাঁট বসে। কাপ্তান বাজারে এবং কাঁটাবনে কিছু স্থায়ী দোকান আছে, যেখানে সারা সপ্তাহ কবুতর ও খাবার পাওয়া যায়।

কবুতরের চিকিৎসা

ঢাকা কেন্দ্রীয় পশু হাস্পাতালের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শহীদ আতাহার হোসেন জানান, কবুতরের একটি অতিপরিচিত রোগ রানিক্ষেত। এ রোগ প্রতিরোধে কবুতরকে তিন দিন বয়সে, ২১ দিন বয়সে এবং এরপর প্রতি দু মাস অন্তর প্রতিষেধক টিকা দিতে হয়। বসন্ত রোগের জন্য ডিম পারার আগে মা কবুতরকে এবং বাচ্চাকে ২১ দিন বয়সে  টিকা দিতে হয়। কলেরার জন্য জন্মের দুই মাস বয়সে টিকা দিতে হয়। কবুতরের ঠান্ডা জ্বর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেনামাইসিনের সঙ্গে মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। রোগ হলে নিকটস্থ পশু হাস্পাতালে যোগাযোগ করতে পারেন। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ঢাকা কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালে পাবেন কবুতর চিকিৎসা বা কবুতরের যাবতীয় চিকিৎসাসেবা।

লাভের হিসাব

জোড়া ২০০ টাকা হিসাবে ৩০ জোড়া দেশি কবুতরের দাম পড়বে ৬০০০ টাকা। ঘর বাবদ খরচ হবে ২০০০ টাকা। খাবার ও অন্যান্য খরচ হবে মাসে গড়ে ১০০০ টাকা। প্রতি মাসে গড়ে বাচ্চা পাওয়া যাবে ২৫ জোড়া, দুই মাস পরে প্রতি জোড়া কবুতর ২০০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। ২৫ জোড়া কবুতর বিক্রি করে পাওয়া যাবে ৫০০০ টাকা। মাসিক খরচ বাদে প্রতি ৩০ জোরায় লাভ থাকবে ৪০০০ টাকা। বেশি পালন করলে লাভ বাড়বে। বিদেশি রেসার ও শৌখিন কবুতর পালন করা গেলে লাভের পরিমাণ বাড়বে কয়েকগুন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.