কিভাবে দীর্ঘায়ু হবেন

মা-বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জিন গত বৈশিষ্ট্যের কারণেই শুধু নয়, অনন্য কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসরন করেও আপনি আপনার দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারেন। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষনায় সে বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই আসুন জেনে নেই দীর্ঘ জীবন লাভের প্রমানিত স্পষ্ট উপায়গুলোঃ


Related Post: বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ


মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেবে দীর্ঘজীবনঃ

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর বিবেকপ্রান হৃদয় আপনাকে দেবে দীর্ঘজীবন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি আপনার দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকখানি। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান ফোর্ড ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ডা. লুইস টারম্যান। ১৯২১ সালে তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষনা কার্যক্রমের সূচনা করেন, যেখানে ১৯১০ সালে জন্ম নেয়া প্রায় দেড় হাজার শিশুর ব্যক্তিগত জীবনাচার ও তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়। পরবর্তীকালে এ গবেষনার কাজ এগিয়ে নেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজিস্ট প্রফেসর  হাওয়ার্ড ফ্রেডম্যান ও বিংশ শতাব্দীর  আরেক খ্যাতিমান এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট লেসলি মার্টিন।

গবেষণার ফলাফলে তারা দেখান, সেসব শিশুদের মধ্যে যারা পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর বা জীবনে বিভিন্ন সময়ে অধিকতর বিচক্ষনতা, দূরদর্শিতা, অধ্যবসায়, নিয়ন্ত্রিত জীবনাচারের পরিচয় দিয়েছেন এবং সব মিলিয়ে একটি মানবিক আর দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তারা দীর্ঘায়ু হয়েছেন। শুধু তাই নয়,সবদিক থেকেই তাদের জীবন ছিলো সুখী আর তৃপ্তিময়। এমনটা হওয়ার উপায় কী? এ প্রশ্নের উত্তরে লেসলি মার্টিনের পরামর্শ- এ ধরনের একজন মানুষে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে ছোট ছোট পদক্ষেপ গ্রহন করুন। আজ থেকেই চেস্টা শুরু করতে পারেন। আর আপানার চারপাশে এরকম মানুষজন যারা আছেন, তাদের সংস্পর্শে থাকুন বেশি বেশি।

বৃত্ত ভেঙ্গে বাইরে আসুনঃ

রবীন্দ্রনাথের গান আছে– আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া ,বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া। তাই নিজস্ব গন্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসুন। জীবনে নির্মল আনন্দের যোগান দিতে পারে এমন বিভিন্ন বিষয়ে হয়ে উঠুন কৌতূহলী। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরচিত হোন, চারপাশের মানুষের সাথে আপনার যোগাযোগ বাড়ান, আপনার পরিচিতির বলয়টা আরো বিস্তৃত  হয়ে উঠুক। লাভ আপনারই । আপনি দীর্ঘায়ু হবেন।

গবেষকরা বলছেন, চারপাশের মানুষের সাথে মমতাপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ আপনার দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা বাড়ায়। দীর্ঘদিন বাঁচার ইচ্ছা- আকুতিকে করে সুতীব্র। জীবনের সাথে যোগ করতে পারে অতিরিক্ত কিছু দিন। কারণ,ভালবাসা আর মমতার মতো মানবিক অনুভূতিগুলো মানুষকে ইতিবাচকতার দিকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। জীবন হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ। অন্যদিকে, সামাজিক বিচ্ছেদ বা একাকিত্বে মানুষকে  নেতিবাচক ও বিষন্ন করে তোলে।   হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায়। মনোবিদ লেসলি মার্টিন বলেন, যারা সহজেই অন্যের সাথে মিশতে পারেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন তারা তুলনামূলক দীর্ঘজীবি হন।

আশাবাদি হোন, সুস্থ থাকবেনঃ

পৃথিবীজুড়ে বহু শতবর্ষী মানুষের ক্ষেত্রে একটি উল্ল্যেখযোগ্য মিল খুঁজে পেয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা– সেটি হলো জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা বেশ আশাবাদি ছিলেন। আর আশাবাদি মানুষেরা জীবনের প্রতি উৎসাহী হন। সেই সাথে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখেন ধূমপানসহ নানারকম স্বাস্থ্যঘাতী আচরন-অভ্যাস থেকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হচ্ছে, এরা স্ট্রেস-এ ভোগেন কম, তাই স্বভাবতই অন্যদের সাথে তাদের পার্থক্যটাও হয় উল্লেখযোগ্য এবং স্ট্রেস জনিত স্বাস্থ্য-জটিলতা থেকে তারা প্রায়শই মুক্ত থাকেন।

নিঃস্বার্থ সেবা দিন, অন্যের জন্য কিছু করুনঃ

দীর্ঘায়ু হওয়ার উপায় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যারা গবেষণা করেছেন, তাদেরই একজন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশাল সাইকোলজিস্ট সারা কনরাথ। তার মতে,কেবল নিজের জন্যে নয় বরং অন্যের জন্যে, বিশেষত  নিঃস্বার্থভাবে যারা অন্যকে সহযোগিতার কথা ভাবেন, এমনকি  অচেনা- অপরিচিত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যান,কাজে নেমে পড়েন তাদের দীর্ঘজীবী হওয়ার  সম্ভাবনা বেশি। গবেষনায় এমনতর ফলাফলে কনরাথ নিজেই বিস্মিত। কারন, দেখা গেছে, এই শ্রেণীর মানুষেরা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক চার বছর অবধি বেশি বাঁচতে পারেন। তিনি বলেন, এর কারন বুঝি এটাই যে অন্যের জন্যে নিঃস্বার্থ সেবায় মনে যে আনন্দ –অনুভূতির সঞ্চার হয়, তার ফলে শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের প্রবাহ বাড়ে। আর এ হরমোনটি শরীরের স্ট্রেস-হরমোনগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং শরীরকে রাখে টেনশন ও অস্থিরতার প্রভাবমুক্ত।

চাই সুখী দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনঃ

দীর্ঘায়ুর পথে বিয়ে, বিশেষত সুখী দাম্পত্য জীবনও হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। মনোবিজ্ঞানী মার্টিন বলেন,সুস্থ সুখী দাম্পত্য জীবনযাপন করেন যারা, তাদের জীবন অনেকাংশেই শান্তিপূর্ণ হয়। দীর্ঘায়ু অর্জনে এটি সহায়ক বটে। তাই দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সুখী পারিবারিক জীবনে প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রফেসর ফ্রেডম্যান। মমতাময় পারিবারিক পরিবেশ প্রত্যেকের মানসিক যোগাযোগ ,ভাব- বিনিময় আর পারস্পরিক সহোযোগিতার একটি চমৎকার আবহ থাকে, টেনশন মুক্ত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্যে যা দারুন কার্যকর।

শ্রম সহিষ্ণুতা ও সফল কর্মজীবনঃ

কাজে আনন্দ পান যারা,তাদের জন্যে সুসংবাদ- তাদের রয়েছে তুলনামূলক বেশিদিন বাঁচার সম্ভাবনা। বিজ্ঞানীদের মতে, আলস্যপূর্ণ দিনযাপনে মধ্যে নয়, বরং যারা নিজেদের কাজ, কর্মক্ষেত্র আর বিভিন্ন ধরনের শ্রমনির্ভর কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পান এবং কোনোরকম অবসর যাপনের কথা ভাবেন না, তারা সত্যিই দীর্ঘায়ু হতে পারে। নিজেদের ক্যারিয়ার আর সামগ্রিক কর্মজীবন নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন যারা, তারাও হাসতে পারেন আনন্দের হাসি। কোমর বেঁধে  এবার লেগে যেতে পারেন দীর্ঘ জীবনযাপনের প্রস্তুতি নেয়ার কাজে। কর্মক্ষেত্রে নানারকম সাফল্য আর অর্জনের ফলে মনে যে তৃপ্তি আসে, তা জীবনে বাড়তি আয়ু যোগ করতে পারে  বলে গবেষকরা জানান।

জীবনযাপনে সচেতন হোনঃ

জাপানের বার্ধক্য বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টোকিও মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউট অব জেরোন্টোলজিও। এর অন্যতম গবেষক ইউকি মুসাই। টোকিওর ৭০ জন অধিবাসীকে (যাদের বয়স ১০০ থেকে ১০৬ বছরের মধ্যে) নিয়ে  তিনি একটা গবেষনা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাতে দেখা যায়, যারা প্রায়শই তাদের বয়স-বৃদ্ধি নিয়ে ভীত ও চিন্তিত ছিলেন এবং কোনোকিছু নিয়ে খুঁত খুঁতে বা ক্ষ্যাপাটে আচরন করেছেন তারা বিষণ্ণতাসহ নানাবিদ মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছেন বা স্নায়ুবৈকল্যে ভুগছেন,যা তাদের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। গবেষকরা তাই বলছেন, বয়স নিয়ে অযথা ভীত হবেন না, একে জীবনের আর দশটা বিষয়ের মতো সহজ ও ইতিবাচকভাবে গ্রহন করুন। এটি যারা পারেন-দেখা গেছে, তাদের জীবনযাপন বেশ নিয়মতান্ত্রিক আর পরিমিত। তাই ভয় নয়, বরং সচেতন হোন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ধীরে সুস্থে সব কাজকর্ম করা ইত্যাদি জীবনাচার অনুসরনে উৎসাহী হোন। আর দীর্ঘায়ুর জন্যে এটাই দরকার বলে মনে করছেন আধুনিক ধারার চিকৎসক ও মনোবিজ্ঞানিরা।


Related Post: গুগল এডস্যান্স কি


নিচে কমেন্টস বক্সে আর্টিকেল বিষয়ে মতামত দিন

শেয়ার করার মাধ্যমে আপনার বন্ধুদের এই আর্টিকেল বিষয়ে জানার সুযোগ করে দিন