কিভাবে মা-বাবার প্রতি ক্ষোভ-অভিমানের প্রতিকার করবেন

আমার মা-বাবা আমাকে বোঝে না, ভালোবাসে না, আমার স্বাধীন বিকাশের পথে অন্তরায়, কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার নিগড়ে বন্দি করে রেখেছে আমায়। মা-বাবাকে নিয়ে এমন অভিযোগ আমরা অনেকেই করি। অনেক সময় তা যথার্থও। কারন তারা হয়তো তাদের চিন্তাটা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন বা নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাচ্ছেন সন্তানকে দিয়ে। আর মা-বাবার এই চাওয়া থেকেই সন্তানদের মনে তৈরি হয় ক্ষোভ ও অভিমান। কিন্তু এই ক্ষোভের নীট রেজাল্ট কী? আরো ক্ষোভ আরো ব্যর্থতা এবং আরো হতাশা।

 

কিন্তু ব্যাপারটাকে যদি এভাবে দেখা যায়- মা-বাবা গ্রেটেস্ট হতে পারেন, কিন্তু আমরা তো লেটেস্ট। লেটেস্টের দায়িত্ব সব সময় বেশি, তাই মা-বাবা যদি আমাদের বুঝতে না পারেন, বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের। তাদের বোঝাতে হবে সেই ভাষায় যে ভাষা তারা বোঝেন। আর তা হল শ্রদ্ধার ভাষা, মমতার ভাষা, ভালবাসার ভাষা-যে ভাষার কোনো জেনারেশন গ্যাপ নেই। আর যদি এমন হয়- সমবয়সীদের দ্বারা বা মিডিয়ার চাকচিক্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে আপনার এ চাহিদা, যা দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই, তাহলে তাদের অক্ষমতাকে মেনে নেয়া উচিত।

আসলে বাইরে বন্ধু-বান্ধব্দের সাথে আমরা খুব সুন্দর আচরন করি- দেখে মনে হয় এত ভালো ছেলে, এত ভালো মেয়ে আর হয় না। কিন্তু বাসায়? বাসায় আমাদের মেজাজ খুব খারাফ থাকে। ঝাড়ি দেয়া ছাড়া কোন কথা বের হয় না। আর এখানেই আমাদের ভুলটা হয়ে যায়। কারন উচ্চস্বরের শব্দ কানে প্রবেশ করে, আর যে শব্দ ধীর-স্থীর ভাবে আস্তে আস্তে করা হয় সে শব্দ হৃদয়ে প্রবেশ করে। ফলে যত আস্তে কথা বলবেন সেটি মা-বাবার হ্রদয়ে ঢুকবে, আর যত জোরে বলবেন সেটি এক কান দিয়ে ঢুকাবে আরেক কান দিয়ে বের করে দিবে। কারন তারা মনে করছে এটা বয়সের দোষ, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তাই এই ক্ষোভ-রাগ-অভিমানকে মা-বাবা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আর ওদিকে আমরা মনে করি, যতটুকু মনোযোগ মা-বাবা দেয়া দরকার তা আমাদের দিচ্ছেনা। ফলে উত্তেজিত হয়ে এমন সব আচরন করছি যা আমাদের মা-বাবার কাছ থেকে আরো দূরে নিয়ে যাচ্ছে।

আসলে মা-বাবা হচ্ছেন গাছের মতো যার ফল আর ছায়ায় বেড়ে ওঠে সন্তানের জীবন। সন্তানের জন্যে অনেক মা-বাবাই গাছের মতোই নীরবে নিঃশেষ করে দেন নিজেকে।গাছের একটি প্রাচীন গল্প আমাদের চোখ খুলে দিতে পারে—-

অনেক কাল আগে এক গ্রামে ছিলো বিশাল এক আম গাছ। একটি শিশু রোজ এসে সেই গাছের ডালে ঝুলে খেলা করতো। আম পেড়ে খেতো। দুপুরবেলা ক্লান্ত হয়ে সেই গাছের নিচেই খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিতো।গাছও শিশুটির এই আনন্দে যোগ দিতো। গাছটি তাকে গ্রহন করলো বন্ধু হিসেবে। কিন্তু একদিন সে এলো না। অপেক্ষা করে করে গাছ বুঝলো আজ আর সে আসবে না। এভাবে কেটে গেলো অনেকদিন। হঠাৎ একদিন দেখা গেল একটি বালক মন খারাফ করে বসে আছে গাছের গোড়ায়। সেই শিশু এখন বালক হয়েছে।

গাছ জিজ্ঞেস করলো- কী হয়েছে প্রিয় বন্ধু আমার? কেন তুমি এতদিন আসোনি? ছেলেটি বললো, আমি এখন বড় হয়েছি। গাছ নিয়ে খেলতে আর আমার ভালো লাগে না। আমার এখন খেলনা দরকার। কিন্তু  আমার কাছে টাকা নেই। গাছ বললো, আহা! কিন্তু বন্ধু, টাকা তো আমার কাছেও নেই। তুমি না হয় আমার আমগুলো সব পেড়ে নিয়ে যাও। এগুলো বিক্রি করলে নিশ্চয়ই কিছু টাকা পাবে। বালকটি তা-ই করলো। কিন্তু এরপর আর সে এলো না। গাছ অপেক্ষা করছে।

অনেকদিন পর এক সুঠাম দেহের যুবক এলো সেখানে। গাছ চিনতে পারলো তাকে। খুশিতে আটখানা হয়ে বললো, এসো বন্ধু! আমরা আবার আগের মতো খেলি। রুক্ষস্বরে যুবকটি জবাব দিল- না, না, খেলার সময় আমার নেই। আমাকে এখন সংসারের জন্যে রুজি-রোজগার করতে হয়। আমার এখন একটা ঘর দরকার। গাছটি বললো, ও আচ্ছা, কিন্তু ঘর তো আমার নেই। তুমি বরং আমার ডালপালা গুলো সব কেটে নিয়ে যাও। এগুলো দিয়েই বানাতে পারবে তোমার ঘর। যুবকটি তাই করলো। যুবককে খুশি দেখে গাছের মনও আনন্দে নেচে উঠলো। 

কেটে গেল আবারো অনেকদিন, নিঃসঙ্গ গাছটি এখনো অপেক্ষা করে প্রিয় বন্ধুকে দেখার আশায়। অনেক বছর পর এক মধ্যবয়সী পুরুষ এসে দাঁড়ালো গাছের নিচে। গাছ তাকে দেখে আনন্দিত হলো। প্রিয় বন্ধু এসেছে। মন খারাফ দেখে জিজ্ঞেস করলো কি ঘটনা? সে বললো, সংসারের ধকল সামলাতে সামলাতে আমি ক্লান্ত। মনটাকে চাঙ্গা করার জন্যে আমি এখন সমুদ্রে বেরিয়ে পড়তে চাই। কিন্তু আমার যে কোনো নৌকা নেই। গাছ বললো, ভাবনা কি বন্ধু! আমার কান্ডখানা নিয়ে যাও। এটা দিয়েই নৌকা বানাতে পারবে তুমি। প্রাচীন গাছের বিশাল কান্ড ঠেলায় চাপিয়ে নিয়ে চলে গেল সে মধ্যবয়সী পুরুষ।

অনেক বছর পর লাঠীতে ভর করে ধীর পায়ে গাছের সেই জায়গায় এসে দাঁড়ালো বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধ। মৃতপ্রায় শেকড়ের একটা ঢিবি ছাড়া গাছের কিছুই আজ অবশিষ্ট নেই। তবুও সে বলে উঠলো, এসেছো বন্ধু! কিন্তু তোমাকে দেয়ার মত আমার যে আর কিছুই নেই। ফল নেই, ডাল নেই, কান্ড নেই। কী দিয়ে আমি তোমার সেবা করবো বল? বৃদ্ধ বললো, ওসব দিয়ে আজ আমার কোনো কাজ নেই। আমি এখন ক্লান্ত অবসন্ন। বিশ্রামের একটু জায়গাই এখন আমার চাওয়া। গাছ বললো, বন্ধু, বুড়ো গাছের মরা শেকড়ের চেয়ে বিশ্রামের ভালো জায়গা আর কী হতে পারে? ঠেস দিয়ে বসো। সব ভাবনা ভুলে নিশ্চিন্তে আরাম কর। বৃদ্ধ তাই করলো। অনেক দিন পর হাসলো নিঃসঙ্গ গাছ। কাঁদলও। তবে এ কান্না আনন্দের। হারানো প্রিয়জনকে কাছে ফিরে পাওয়ার খুশিতে।

এই শিশু থেকে বৃদ্ধে পরিনত হওয়া মানুষটিকে কি আপানার নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে? অকৃতজ্ঞ মনে হচ্ছে? তাহলে মনে করে দেখুন তো- আপনার মাকে কি আপনি কখনো ধন্যবাদ দিয়েছেন- আপনাকে ধারন, লালন, এবং পালনের খুঁটিনাটি কাজগুলো বছরের পর বছর ধরে অম্লান বদনে করে যাওয়ার জন্যে? বাবাকে কি কখনো থ্যাংঙ্কস জানিয়েছেন কষ্টার্জিত উপার্জনে আপনাকে আজকের অবস্থান গড়ে দেয়ার জন্যে? শাসলের আড়ালে স্নেহপূর্ণ মন নিয়ে আপনাকে সঠিক পথ–নির্দেশনার জন্য হয়তো আপনি-আমি, মনে করতে পারবো না। কারন মা-বাবা আমাদের জন্যে যা কিছু করেন আমরা ধরে নেই যে এটা তো তাদের দায়িত্ব। কিন্তু ভেবে দেখুন, এর যেকোন একটি ক্ষেত্রেও যদি তারা দায়িত্বটি পালন না করতেন, কী অবস্থা হতো আপনার-আমার! কত অসহায় হয়ে পড়তাম আমরা।