কিভাবে সময়ের সঠিক ব্যবহার করা যায়

ধ্যাত, এবারো লেট হয়ে গেল। পড়বো পড়বো করে এবারও কিছুই পড়া হলো না, ঠিক আছে, এবারের এক্সামটা কোনোরকম দেই, সামনের বার এক্সাম শুরুর আগেই সব পড়ে শেষ করে ফেলবো।

উফফ!! কাজটি এখনো শেষ করতে পারলাম না, কবে যে শেষ করবো, বস তো আজো জিজ্ঞেস করলো, কী যে করি। আমার দ্বারা মনে হয় এই চাকরিটা আর কন্টিনিউ করা সম্ভব হবে না।

প্রতিনিয়ত এরকম কিছু ঘটনা থেকেই আপনার মনে হল আপনি সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে পারেন না, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসও কমে গেলো অনেকখানি। একটা সময় আপনার অবচেতন মন সেটা বিশ্বাসও করা শুরু করলো যে আপনি সময়মত কিছুই করতে পারেন না। সময় আপনার নিয়ন্ত্রনে নেই, আর যখন আপনি বুঝবেন যে আপনার সময় আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তখন এর থেকে তৈরি হবে মানুসিক চাপ। কিন্তু এরকম করে কি জীবনে এগিয়ে যাওয়া যায়? যায় না, কারন আমরা চাইলেই সময়কে সঞ্চয় করে রাখতে পারবো না, পুনরুদ্ধারও করতে পারবো না। এজন্য সময়কে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে হবে।

সময়কে সঠিক ভাবে ব্যবহারের জন্য আপনি আপনার অবচেতন মনকে সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে হবে, অবচেতন মন মানে আমাদের সাব কন্সাস মাইন্ড, আমরা যেমন চিন্তা করি, নিজেদের যেরকম ভাবি আমাদের তেমনই মনে করে। যদি আপনি নিজেকে একজন দক্ষ সময় পরিচালক হিসেবে ভাবেন এবং ধারাবাহিক ভাবে এই ভাবনা অব্যাহত রাখেন তাহলে আপনার সাব কন্সাস মাইন্ড, আপনাকে দিয়ে এমন সব কাজ করাবে যেটি আপনাকে একজন দক্ষ সময় পরিচালক হিসাবে পরিচালিত করবে। আর এর উল্টোটা ভাবলে অবচেতন মন আপনাকে দিয়ে শুধু সময় অপচয় করাবে। তাই কল্পনায় নিজেকে একজন দক্ষ সময় ব্যবস্থাপক হিসেবে ভাবুন। সময়মত কাজ করলে কিভাবে উপকৃত হবেন সে চিন্তা করুন। এতে সময়ের সঠিক ব্যবহার করা আপনার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে, কারণ আপনি কল্পনায় নিজেকে যেমন ভাববেন, ঠিক তেমনি বাস্তবে নিজেকে দেখবেন।

এডোয়ার্ড এ মারফি জুনিয়রের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো- কোনকিছু করার আগে আপনাকে অন্যকিছু করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনা আয়ত্বের আগে আপনাকে নিজের জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে জানতে হবে, আপনার লক্ষ্য সম্পর্কে আপনার পরিস্কার ধারনা থাকতে হবে, জানতে হবে আপনার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য কি, পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য কি। আর লক্ষ্য নির্ধারন যে কত জরুরী তা এই কৌতুকটি শুনলে বুঝতে পারবেন-

এক দম্পত্তি গাড়ি করে সান ডিয়াগো থেকে লস এঞ্জেলস যাওয়ার জন্য রওনা দিল। হাজবেন্ড গাড়ি চালাচ্ছিলো। যদিও সে রাস্তাটি ভালোভাবে চিনে না, তারপরও সে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল। কিছু সময় পর, তাঁর স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলো- জন, লস এঞ্জেলস যাওয়ার পথে কি ফোনিক্স পড়ে?হাজবেন্ড বললো, তুমি একথা কেন জিজ্ঞেস করছো? স্ত্রী বললো, আমি এই মাত্র সাইনবোর্ডে দেখলাম আমরা ফোনিক্স পার হচ্ছি। হাজবেন্ড উত্তর দিল, এটা কোন ব্যাপার না। আমরা খুব ভাল সময় কাটাচ্ছি।তাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য কি সেটা জীবণের গতি বৃদ্ধির পূর্বেই নির্ধারন করে নিতে হবে।

তাহলে আসুন জেনে নেই সময়ের সঠিক ব্যবহারের কিছু কার্যকরী কৌশলঃ-

১। লিখিত পরিকল্পনা করুনঃ

লিখিত পরিকল্পনার এক মিনিট কর্মক্ষেত্রের ১০ মিনিট করে সময় বাঁচায়। পৃথীবিতে যত সফল সময়নিষ্ঠ ব্যক্তি আছেন তাঁরা সকলেই ভালো পরিকল্পনাবিদ। পরিকল্পনার তালিকাকে তারা পর্যায়ক্রমে এবং গুরুত্ব অনুসারে সাজায়। তাই প্রথমে পর্যায়ক্রমে তালিকা করে এটাকে সময় গুরুত্ব অনুসারে সাজিয়ে নিন। কখন কোন কাজটি করবেন, এক এক করে, একদম প্রথম থেকে ধাপে ধাপে শেষ পর্যন্ত সবকিছু লিখে ফেলুন। এ বিষয়ে হেনরি ফোর্ড বলেছিলেন, বড় বড় লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হয় ছোট ছোট অংশে ভাগ করে।

২। গুরুত্ব অনুসারে কাজকে সাজিয়ে নিনঃ

রুটিন বা কর্মসূচি তৈরি করতে প্রনীল পদ্ধতি ব্যবহার করা খুবই ইফেক্টিভ; প্রনিল মানে- প্রতিদিনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য। এই পদ্ধতিতে গুরুত্ব অনুযায়ী কাজের তালিকা ১,২,৩,৪,৫ অনুসারে সাজান। যে কাজগুলো ১ নম্বরে রাখবেন তা অবশ্যই করতে হবে। এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক কাজ। ২ নম্বরে রাখবেন যেগুলো করা উচিত। আর ৩ নম্বরে রাখবেন যেগুলো করা যায়। ৪ নম্বরে রাখবেন সেসব কাজ যেগুলো আপনি অন্য কাউকে দিয়ে করাবেন বা করাতে পারবেন। কারণ আপনার লক্ষ্য থাকবে ১ নম্বর কাজ গুলোতে কত বেশি সম্ভব বেশি সময় দেয়া যায়। ৫ নম্বরে এমন কাজ থাকবে যেগুলো থেকে আপনি দূরে থাকবেন। আসলে ঘটনা হচ্ছে, আপনার তো সময় খুব সীমিত, তাই কোন কাজগুলো থেকে  আপনাকে বিরত থাকতে হবে সেটাও আপনার জানা থাকতে হবে। কেননা সাফল্য অর্জন করতে হলে কী করতে হবে তা জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কী করতে হবে না, তা জানা আরো গুরুত্বপূর্ণ।

৩। দৈনিক কর্ম তালিকা করুনঃ

প্রতিদিনের কাজের তালিকা প্রতিদিন তৈরি করুন। আর এই কর্ম তালিকা তৈরি করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে আগের রাত্রি। আপনি পরের দিনের তালিকা তৈরি করে ঘুমিয়ে পড়লে আপনার অবচেতন মন ঐ তালিকার ওপর কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে ঘুম থেকে উঠে এমন কিছু সৃজনশীল ধারনা পেয়ে যেতে পারেন যা আপনার কর্মসূচি আরো ভালো ভাবে সম্পাদন করতে সহায়তা করবে।

৪। ৮০/২০ প্রিন্সিপাল

আপনার তালিকায় এমন ২০% কাজ আছে যেগুলো ৮০% কাজের সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন এই ভিডিওটি। এই ভিডিওটি আপনাদের জন্য দেখার উপযোগি করে তৈরি করার জন্য ভয়েস রেকর্ড করা, এনিমেশন সেট করা, মিউজিক এড করা- এসবের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিডিওটির স্ক্রিপ্ট বা কন্টেন্ট সুন্দর করে লেখা। যদি ভিডিওটির কন্টেন্টই ভালো না হয়, বাকি সব কাজই বৃথা হয়ে যাবে। তাই আপনার কাজের মধ্যে কোন ২০% কাজ বাকি ৮০% কাজের সমান গুরুত্ব বহন করে তা খুঁজে বের করে আগে সেগুলো করুন।

৫। নোটিশ ব্যবহার করুনঃ

নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করার জন্য, আপনার কাজে পুর্ণ মনযোগের জন্য বিরক্ত করবেন না নোটিশ ব্যবহার করুন। আপনার রুমে বা ডেস্কের সামনে বিরক্ত করবেন না নোটিশ লাগানো দেখলে সবাই বুঝবে খুব মারাত্নক কিছু না হলে রুমে প্রবেশ করা বা নক করা যাবে না।

৬। অনাহূত যোগাযোগ সংক্ষিপ্ত করুনঃ

যখনই অপ্রত্যাশিত কেউ আপনার রুমে ঢুকবে সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যান। তাকে বলুন- আমিও বাইরে যাচ্ছিলাম। আপনার জন্য কি করতে পারি। তাঁর পর তাকে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলুন। কথা বলার সময় একটু কৌশল করে কথা বলুন- হ্যালো,শ্যামল- কেমন আছেন, আমি আপনার জন্য কি করতে পারি ?