কিভাবে সীমাবদ্ধতাকে শক্তি হিসেবে কাজে লাগাবেন

যার হারানোর কিছু নেই, তিনিই নিশ্চিত মনে সামনে এগুতে পারেন। কারণ তাঁর কোনো পিছুটান থাকে না। এটাই তাঁর গ্রাউন্ড জিরো। তিনি যানেন এখান থেকেই শুরু করতে হবে।শতকরা ৯০ জন সফল মানুষই আর্থিক, পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছেন। তারা সেখান থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সাফল্যের পথে এগিয়ে গেছেন। আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতাই তাদের ভিতরে শক্তির জাগরনের কারণ হয়েছে।মহাকবি হোমার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। অমর সুরস্রষ্টা বেটোভেন জীবনের শেষ বছরগুলোয় কিছুই শুনতেন না। কলকাতার মাসুদুর রহমান দুই পা কাটা পড়ার পরও ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কেটে ১৯৯৫ সালে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেন।

১০ এপ্রিল, ২০১০- দৈনিক ইত্তেফাকের একটি রিপোর্ট ছিলো- সহপাঠীরা বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। পাশেই মেঝেতে চটে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে প্রতিবন্ধী কফিল উদ্দিন। তাঁর দুই হাত–পা থেকেও নেই। এসএসসি পাশ করার পর অভাবের কারণে চট্টগ্রামে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে যায় সে। সেখানে একটি ভবনের ছাদে রড বাঁধাই করতে গিয়ে বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায়। চিকিৎসার সময় দুই হাতের কনুই ও দুই পায়ের হাঁটুর নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। গ্রামের বাড়িতে ফিরে সে মায়ের ছোট্ট মুদির দোকানে কাজ করে। লেখাপড়ায় আগ্রহ ছিলো প্রবল। প্রথমে মুখে কলম নিয়ে লেখার চেষ্টা করে, হয় না। পরে দুই কনুইয়ের মাঝখানে কলম ধরে লেখার চেষ্টায় তিন বছরে সফল হয়। এখন সে দ্রুত লিখতে পারে। এইচএসসি পরীক্ষার শতভাগ উত্তর সে নির্ধারিত সময়েই লিখেছে। লেখাপড়া শেষ করে সে বিচারকের হতে চায়।

সীমাবদ্ধতা কীভাবে শক্তি হতে পারে, প্রতিবন্ধীত্বও কীভাবে সাফল্যের উৎস হতে পারে, এ নিয়ে জেনের বিখ্যাত গল্প রয়েছে-  

এক জাপানি বালক। ১৩ বছর তাঁর বয়স। একটা দুর্ঘটনায় বাম হাত হারিয়ে ফেললো। তাঁর ছিলো জুডো শেখার প্রচন্ড আগ্রহ। কিন্তু যেহেতু তাঁর বাম হাত নেই, কোনো জুডো-গুরু তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহন করতে রাজি হলেন না- বাম হাত নেই, একে কী শেখাবো? জুডো তো একটা সাংঘাতিক ব্যাপার! যেটার জন্যে দুটো হাতের প্রয়োজন। ছেলেটি এই গুরুর কাছে যায়, ঐ গুরুর কাছে যায়। সবাই শুধু বলে যে না, তুমি জুডো শিখতে পারবে না। তোমার জন্য এগুলো নয়। তুমি বরং অন্য কিছু করো। কিন্তু বালক বিশ্বাসে অটল। বাম হাত নেই তাতে কী? জুডো সে শিখবেই। ঘোরাঘুরি করতে করতে শেষমেশ সে এক বয়োবৃদ্ধ গুরুর সন্ধান পেলো। বালকের শেখার আকুতি দেখে গুরুর মায়া হলো। তিনি তাকে বললেন যে ঠিক আছে, আমি তোমাকে শেখাবো। তবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আমি যা বলবো তা তুমি মানবে এবং লেগে থাকবে।

শুরু হলো তাঁর জুডো শেখা। দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস গেল। বছর পার হলো। একসময় ছেলেটি অবাক হয়ে লক্ষ করলো- প্রতিদিন তাঁর গুরু তাকে একটা কৌশলই, জুডোর একটি প্যাঁচই কেবল শেখাচ্ছেন। ডান-বাম, সামনে–পেছনে আর কিছুই না। শুধু একটাই কৌশল, একটাই প্যাঁচ। একসময় তাঁর মনে প্রশ্ন জাগলো, দুঃখ হলো- জুডোর এতো প্যাঁচ আছে, সব বাদ দিয়ে গুরু আমাকে শুধু একটি প্যাঁচ শেখাচ্ছেন? আবার সাহসও পায় না যে, গুরুর সামনে বললে আবার  না বেয়াদবি হয়ে যায়। একদিন সাহস করে বলেই ফেললো যে, সেনসেই! আমি কি আর কোনো কৌশল শিখবো না? –বললো খুব করুণ স্বরে। গুরু জবাব দিলেন, তুমি একটি কৌশল শিখছো আর এই একটি কৌশলই, একটি প্যাঁচই তোমার ভালোভাবে রপ্ত করা দরকার। অতএব একাগ্রচিত্তে অনুশীলন করে যাও।

গুরু বলে দিয়েছেন। তাঁর কাছে এটুকুই যথেষ্ট। যেহেতু গুরু তাকে খুব স্নেহ করেন, একটা প্যাঁচই মমতার সাথে বার বার-বার বার শেখাচ্ছেন- সে অনুশীলন করে চললো। পাঁচ বছর পার হয়ে গেলো এই একটা প্যাঁচ শিখতে। দীর্ঘ অনুশীলনে এই প্যাঁচের সবকিছু দারুণভাবে রপ্ত করলো সে। এবার গুরু সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে প্রতিযোগিতায় নামানোর। প্রতিযোগিতা শুরু হলো। প্রথম দুই ম্যাচে খুব অনায়াসে সে ঐ এক প্যাঁচ দিয়েই দুজনকে হারিয়ে দিল। এবার ফাইনাল। ফাইনাল ম্যাচে সে সত্যি সত্যি বেশ বেকায়দায় পড়লো। কারণ তাঁর প্রতিপক্ষ বেশ শক্তিশালী আর অভিজ্ঞ।

একসময় মনে হলো যে, বালকটি বোধহয় হেরে যাচ্ছে। ভীষণ মার খাচ্ছে। রেফারিও বুঝতে পারছে না খেলা কি চালাতে দেবে, না থামিয়ে দেবে। কারণ যেভাবে ছেলেটি মার খাচ্ছে তাতে যেকোনো সময় সে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর গুরু ইশারা করলেন যে, না, খেলা চলুক। বিরতি হলো। গুরু বালকের মাথায় হাত বুলিয়ে উৎসাহ দিলেন। সুন্দর খেলেছো। তুমি জিতবে। খেলা আবার শুরু হলো। শক্তিমান প্রতিপক্ষ অধৈর্য্য হয়ে উঠলো। মরিয়া হয়ে আক্রমন করতে লাগলো। বালক ঠান্ডা মাথায় প্রতিটি আক্রমন কাটাচ্ছে। হঠাৎ প্রতিপক্ষ একটা ভুল করার সাথে সাথে বালক তাঁর প্যাঁচ প্রয়োগ করলো এবং জিতে গেলো। বালক চ্যাম্পিয়ন হলো। চ্যাম্পিয়ন হয়ে বালক তো মহাখুশি। এটা তাঁর কাছে বিস্ময়কর যে, একটিমাত্র কৌশল প্রয়োগ করে সে জিতে গেলো! ফেরার পথে সে গুরুকে জিজ্ঞেস করলো যে, সেনসেই! এই একটি মাত্র কৌশল প্রয়োগ করে আমি জিতলাম কী করে?

তখন গুরু বললেন যে, দেখ, তুমি দুটি কারণে জিতেছো। এক হচ্ছে, তুমি জুডোর খুব দুরুহ একটি কৌশল, খুব কষ্টকর জটিল একটি প্যাঁচকে খুব ভালোভাবে শিখেছো। দুই হচ্ছে, আমার জানামতে এই প্যাঁচ থেকে বাঁচার জন্যে প্রতিপক্ষের একটিই পথ আছে। তা হলো প্রতিদ্বন্দীর বাম হাত ধরে ফেলা। সে যদি তোমার বাম হাত ধরতে পারতো তাহলেই বাঁচতো। কিন্তু তোমার তো বাম হাত নেই। অতএব তুমিই জিতে গেছো।

এই জাপানি বালকের মতো সীমাবদ্ধতাই হতে পারে আমাদের শক্তি, হতে পারে আমাদের বিজয়ের অনুঘটক।