অভ্যাস পরিবর্তনের বিজ্ঞান

দুজন ছাত্রের মধ্যে একজন রাত দিন পড়ার টেবিলে বসে পড়াশুনা করেন আরেকজন দিব্যি গাল-গল্প আর আড্ডায় মেতে থাকেন। একজন মসজিদে গিয়ে পাচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, আরেকজন বাজারে আড্ডায় মেতে থাকেন এবং তার বন্ধুদের সাথে সিগারেট পান করেন। আবার একজন সবার সাথে খুব মার্জিত, ভদ্র, বিনয়ী আচরন করেন এবং অন্যজন কথায় কথায় রেগে যান। এই দুজন ছাত্রের মত আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন যাপন পদ্ধতি ভিন্ন। তো কেন প্রতিটি মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি, চলাফেরা, আলাদা? কেন একজন স্মোকার হচ্ছেন আরেকজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারি হচ্ছেন? পার্থক্যটা মূলত কোথায়?

আসলে একজন মানুষের জীবনের পরিনতি ভাল দিকে যাবে নাকি খারাপের দিকে যাবে- সেটি সম্পূর্ন নির্ভর করছে সে মানুষটির আয়ত্ত্ব করা অভ্যাসগুলোর উপর। যদি কেউ ভাল অভ্যাস তৈরি করে- তাহলে তার জীবন ভালর দিকে যাবে, খারাপ অভ্যাস আয়ত্ত্ব করলে তার জীবন খারাপের দিকে যাবে। আমরা মানুষেরা আর কিছু নয় কেবল আমাদের আয়ত্ব করা কিছু অভ্যাসের সমষ্টি। এ প্রসঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভাসির্টির গবেষক ওয়েন্ডি উড বলেছেন- Fourty to Fourty Five Percent Of Our Daily Behvavious are Habit. প্রতিদিন আমরা যা কিছু করি তার আর্ধেকই আসলে আমদের অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠা, কম্পিউটার গেমস খেলা, মোবাইল ফোনে নোটিফিকেশন চেক করা, গাড়ি ড্রাইভ করা, ফাস্ট ফুড খাওয়া, ব্যয়াম করা, প্রিয়োজনের কথা ভাবা ইত্যাদি সবই আমরা অভ্যাসবশত করি। যে কাজগুলো আমরা একই পরিস্থিতিতে বা পরিবেশে বার বার, বার বার করতে থাকি সেগুলোতে আমরা অটোমেটিক হয়ে যাই। এই কাজগুলো করার জন্য তখন আমাদের সচেতন ইচ্ছা বা প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে না। কাজটি আমরা এতো বেশি বার পুনরাবৃত্তি করে ফেলি- এটার জন্য তখন আমদের আলাদা করে কোন মনোযোগ দিতে হয় না। ফলে আমরা অভ্যাসবশত সেই কাজটি করতে শুরু করি। কারন বার বার এই কাজগুলো করার ফলে আমাদের ব্রেন এই কাজগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং আমাদের সাবকন্সাস মাইন্ড এই কাজগুলোকে তার স্টোরেজ-এ সংরক্ষন করে ফেলে।

আমরা যখন কোন একটা নির্দিষ্ট আচরন বা কাজ বা অভ্যাসের শুরুর দিকে থাকি তখন এই কাজের জন্য আমাদের ব্রেনে একটা নিউরন তৈরি হয়। শুরুর দিকে এই নিউরোন খুব হালকা থাকে। টানা কয়েক সপ্তাহ প্রতিদিন ৪/৫ বার বা যত বেশি বার আমরা নির্দিষ্ট এই আচরন বা কাজ বা অভ্যাসটি রিপিট করবো ততো বেশি এই নিউরোন আগের চেয়ে আরো মজবুত এবং শক্তিশালি হবে। আর কোন নির্দিষ্ট আচরন বা কাজ বা অভ্যাসের নিউরন যত বেশি স্ট্রং বা মজবুত হবে তত কম এনার্জি ব্যয় হবে ব্রেনের এই কাজটি পারফর্ম করার জন্য।  আমাদের জন্য কোন কাজটি ভাল আর কোনটি খারাপ এটি ব্রেন বুঝতে পারে না। আমরা যাই করি- বার বার বার বার রিপিট হওয়া আচরন বা কাজগুলোকেই ব্রেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এবার সেটা যদি স্মোকিং হয়, ব্যয়াম করা হয়, ৮ ঘন্টা ঘুমানো হয়, মাসটারবেশন হয় তাও হবে। ভাল মন্দ ব্রেনের কাছে মেটার করে না। তাই অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য যে অভ্যাসটি গড়তে চাই সেটি বার বার করতে হবে এবং খারাপ অভ্যাস ছাড়ার জন্য প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই খারাপ অভ্যাসের পরিমান কমিয়ে দিতে হবে। তাহলে ভাল অভ্যাসের নিউরন শক্তিশালি হবে, খারাপ অভ্যাসের নিউরন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে একসময় ব্রেন থেকে, সাবকন্সাস মাইন্ড থেকে হারিয়ে যাবে।   

তাহলে আমরা কিভাবে শুরু করতে পারি?

১। সচেতন হওয়া

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠার পর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমরা যা কিছু করি, সে সব কিছু খেয়াল করতে হবে, নোট করতে হবে। ছোট ছোট আচরন বা ঘটনা গুলোও বাদ দেওয়া যাবে না। এভাবে টানা ২/৩ সপ্তাহ আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন বিহেভিয়ারগুলো খেয়াল করি, রেকর্ড করি- তাহলে আমরা বুঝতে পারবো আমরা কি করে চলেছি, কোনটা আমাদের ভাল অভ্যাস আর কোনটি আমাদের খারাপ অভ্যাস। তাহলে আমরা খারাপ অভ্যাস বদলে ভাল অভ্যাস গড়তে পারব। তাই অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য প্রথম করণীয় হল- বর্তমান অভ্যাসগুলো জানা এবং সচেতনে হওয়া আমরা কি করে চলেছি এবং আমাদের কি করা উচিত।

২। ছোট ছোট পদক্ষেপ

অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য আমাদের থিম হবে- Just Getting 1% Better Each Day. প্রতিদিন যে কাজ বা আচরনটি আমরা অভ্যাস হিসেবে গড়তে চাই সেটি অল্প অল্প করে শুরু করে দিতে হবে। আর এই আপাতদৃষ্টিতে মনে হওয়া সামান্য কাজটিই আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দিন বা মাস পর বড় ফলাফল নিয়ে আসবে। অল্প অল্প কাজের মাধ্যমে বা পরিবর্তনের মাধ্যমে পারত পক্ষে আমরা ঐ অভ্যাস তৈরির একটা সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে গেলাম যা ধীরে ধীরে স্ট্রং একটা অভ্যাস গড়তে সহায়তা করে। তাই মনে রাখুন- Tiny Change Make a Big Diffrence.

৩। ধারাবাহিকতা

যে কোন নতুন অভ্যাস তৈরির জন্য যখন ছোট ছোট পদক্ষেপ নেয়া শুরু করি আমরা- ২/৩/৪ দিন পর কোন পরিবর্তন না দেখে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, মোটিভেশন ধরে রাখতে পারি না। Real Change Does Take Time!!  তাই সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য আপনাকে ধারাবাহিক ভাবে ( পরিমানে খুব সামান্য কাজ বা কিছু হলেও) চেস্টা চালিয়ে যেতে হবে। যেহেতু আমাদের ব্রেন রিপিটেশন পছন্দ করে এবং এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাই যদি আমরা কোন কাজ বার বার বার বার না করি তাহলে সে কাজ আমাদের অভ্যাসে পরিনত হবে না। সেজন্য যে অভ্যাস আমরা আয়ত্ব করতে চাই সেটি ধারাবাহিক ভাবে করে যেতে হবে- খুব অল্প যেমন, ৫ মিনিট কোন বই পড়া, ৩ মিনিট মেডিটেশন, ১০ মিনিট হাটা, ৩০ মিনিট টেক্সট বুক পড়া, প্রতিদিন দুটি ইংলিশ ওয়ার্ড শিখা ইত্যাদি। শুরুর দিকে মনে হবে ওয়াক! I hate this behavior, কিছু দিন পর- Okey I can tolerate it এবং I can do that এর পর হঠাৎ করে একদিন যখন এত দিক ধারাবাহিকভাবে করা এই কাজটি  করা বন্ধ করবেন তখন মনে হবে- I really Miss this. ১ সপ্তাহ, ২ সপ্তাহ ইভেন ৩ সপ্তাহ পরে এটি আমাদের কাছে খুব স্বতস্ফূর্ত মনে হবে এবং সাবলীল মনে হবে। তাই যেকোন অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য আমাদের ধারাবাহিক হতে হবে এবং ধৈর্য্য রেখে ক্ষুদ্র পদক্ষেপের মাধ্যমে সামনে আগাতে হবে।

তাই উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়- আমাদের লালিত অভ্যাস যা আমরা বার বার করে আসছি সেসবই আমাদের বর্তমান অবস্থা, আমাদের সুখ এবং দুখের জন্য দায়ী। সেজন্য যে সব অভ্যাস আমাদের জন্য ভাল, প্রয়োজনীয় সেগুলো বার বার বার বার করার মাধ্যমে অভ্যাসে পরিনত করতে হবে।

নিচে কমেন্টস বক্সে আর্টিকেল বিষয়ে মতামত দিন

শেয়ার করার মাধ্যমে আপনার বন্ধুদের এই আর্টিকেল বিষয়ে জানার সুযোগ করে দিন