সম্পর্কে সন্দেহ বা জেলাসির মূল কারণ এবং করনীয়

সন্দেহ করা বা জেলাস ফিল হওয়া আদতে ভাল কিছু নয়। কারণে হোক বা অকারণে হোক সন্দেহ যারা করেন তারা মানসিকভাবে ভালো থাকতে পারেন না। আর এই সন্দেহ একটি রোগ। অনেকগুলো সম্পর্ক নষ্ট হতে দেখেছি কেবল এই সন্দেহ বা জেলাস ফিল এর কারণে।

সন্দেহ বা জেলাসি ফিলের কারণ যদি যথার্থ হয় তাহলে এটি খুবই বেদনাদায়ক একজন মানুষের জন্য এবং এর  সুন্দর সমাধান না করতে পারলে মানসিক ভাবে ভাল থাকা দুরূহ হয়ে যাবে। কেননা কারো কারো মন মানসিকতা অতিরিক্ত আধুনিক। তাই তারা একটা সম্পর্কে থাকার পরেও অন্য অনেকের সাথে (বিপরীত লিঙ্গ) খোলামেলা চলা ফেরা করেন। যিনি খোলা মেলা চলাফেরা করছেন তার পার্টনার হয়ত বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেন না। ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাচ্ছেন। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছেন। আস্তে আস্তে চমৎকার এই সম্পর্কে ফাটল ধরা শুরু হয়, ভুল বোঝাবুঝির পরিমান বাড়তে থাকে। এমন কি ব্রেকআপও হয়ে যায়।

মূলত একেক দেশের সংস্কৃতি/কালচার একেক রকম। ওয়েস্টার্ন কালচারের মানসিকতা নিয়ে কোন মানুষই একজন ইসলামিক মেন্টালিটি নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষের সাথে সংসার করতে পারবে না আবার যদি কারো গার্ল ফ্রেন্ড খুব সৃজনশীল হন, নাচ, গানে আগ্রহ থাকে তার- বিএফ যদি এসব ধারনা লালন না করে কনজারভেটিভ ধারনা পোষন করেন তাহলে তাদের মাঝে সব সময় মারামারি কাটাকাটি লেগেই থাকবে। তাই এটি খুব জরুরি হয়ে যায় একটি সম্পর্ক গড়ার আগে আপনার পার্টনারের মেন্টালিটি ভাল করে জানার চেস্টা করা- বুঝার চেস্টা করা। যদিও কখনও কখনও মেন্টালিটি ম্যাচ করার পরেও সম্পর্কে যে কেউ অন্য কারো দিকে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে পারেন। আর তখনই সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হয় এবং পার্টনার জেলাস ফিল করতে থাকেন, কষ্ট পেতে থাকেন। মূলত যেসব যুক্তিযুক্ত কারনে প্রেমিক- প্রেমিকার মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে তাদের সন্দেহের পিছনে যে প্যারামিটার গুলো কাজ করে তা হলঃ

  • পার্টনারকে আন্তরিক ভাবে গ্রহন না করা, অবহেলা করা, হেয় করা।
  • ক্রমাগত ফাইনান্সিয়ালি বা সেক্সুয়ালি প্রেসারাইজ করা এবং অপারগতা প্রকাশ করলে সম্পর্কছেদের হুমকি।
  • পার্টনারের ফেসবুক মেসেজ নিয়মিত দেখা এবং এই নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা।
  • সম্পর্কের শুরুতে যে টান বা আগ্রহ বা গুরুত্ব ছিল সেই টান বা আগ্রহ বা গুরুত্ব না দেখিয়ে খামখেয়ালি মনোভাব দেখালে।
  • ছোট-খাট বিষয়গুলাতে ঝামেলা করলে- সেসব বিষয় নিয়ে ঝামেলা হওয়ার কথা না, সহজেই মেনে নেয়ার মত।
  • ফেসবুক বা সোসাল মিডিয়াতে মেসেজ পাঠানোর পরে ইগনোর করা এবং এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বিজি ছিলাম, অনলাইনে ক্লাস করছিলাম ইত্যাদি বলা কিন্তু অন্যদের সাথে চ্যাটিং করা।
  • বর্তমান সম্পর্ককে ভাল করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিতে না চাওয়া এবং পার্টনারের এক্সের বিষয়ে কথা বললে- এক্স অনেক ভাল ছিল, হেন তেন এবং এক্সের সাথে যোগাযোগ বা দেখা করার কোন আলামত পাওয়া গেলে।
  • দুর্ব্যবহার, খারাপ ভাষার ব্যবহার, ঠিক মত টাইম না দেয়া, কোন খোঁজ না রাখা, আচার আচরনে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেওয়া ইত্যাদি
  • সম্পর্কের যে মূল লক্ষ্য সেটি নিয়ে কথা না বলা এবং বিয়ে করার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখা দিলে
  • যদি প্রেমিক/প্রেমিকা খুব বেশি দুর্বল হয়ে যান, দিন রাত পার্টনারের কথা ভেবেই সময় কাটান তাহলে হঠাৎ পার্টনারের ছোট থেকে ছোট আচরনেও সন্দেহ করার প্রবনতা দেখা দিতে পারে।  

কিন্তু সন্দেহ যদি অকারনে হয়, বেহুদাই সন্দেহ হয় তাহলে এটি যিনি (প্রেমিক-প্রেমিকা) সন্দেহ করছেন তার সমস্যা। এই সন্দেহ কারো কারো রোগের পর্যায়ে চলে যায়। যারা বেহুদাই সন্দেহ করেন, পার্টনারের স্বাধিনতাকে ক্ষুন্ন করেন, পার্টনারকে নিজের সম্পত্তি মনে করেন, তাদের অনেক কষ্ট পেতে হয় যার কারনে একটি সুন্দর সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতে পারে।

সন্দেহ নিয়ে অনেক প্রেমিক-প্রেমিকার বক্তব্য হল, আমি তাকে সত্যিকারের ভালবাসি তাই তাকে অন্য কারো সাথে শেয়ার করতে চাই না। আর আমি তাকে ভালবাসি বলেই তো এসব করি। এটি একটি ফালতু কথা। মূলত কোন কারণ না থাকার পরেও যারা সন্দেহ করেন তাদের সন্দেহের পিছনে যে প্যারামিটার গুলো কাজ করে তা হলঃ

  • যারা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত তাদের নিজেদের আত্মসম্মানবোধ কম
  • মানসিক কিছু সমস্যা যেমন- অতিরিক্ত ভাব দেখানো, সারাক্ষন উদ্ববিগ্ন থাকা, ইমোশনালি ডিস্টার্ব থাকা ইত্যাদি।
  • পার্টনারকে নিয়ে অনিরাপতত্তায় থাকা বা তার ভালবাসা এবং মনোযোগ পুরোপুরি দখল করতে চাওয়া।
  • পার্টনারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, বিকল্প ভাল কাউকে না পাওয়ার আশঙ্কা।
  • নিজের প্রতি হীনমন্ন্যতা- যে আমি তার যোগ্য না।
  • সব সময় এই ভয়ে ভয়ে থাকা আমার পার্টনার হয়ত আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।

এই সবগুলা ফেকটরই মূলত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোকেদের একধরনের অনিরাপত্তাবোধের কারনে হয়ে থাকে। সন্দেহ এবার উপযুক্ত কারনে হোক বা অকারনে হোক এটিকে জিয়িয়ে রাখলেই সমস্যা। তাই যত দূত সম্ভব এটিকে সমাধান বা নির্মূল করে ফেলতে হবে। তো কিভাবে এই জেলাস ফিল বা সন্দেহ থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি?

১। জেনে রাখুন-জেলাস ফিল বা সন্দেহ আসলে নিছক ভয় মাত্রঃ

সন্দেহ বা জেলাস ফিলের গোড়ার দিকের কারণ হল আপনার মনের ভয়, যদি সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়? তাহলে আমার কি হবে? এই ভয়ের মূল উৎস পার্টনারের অতীতের করা কোন বিদ্রুপ আচরন অথবা আপনার নিজের ভিতরের ইন্সিকিউরিটি।

যদি পার্টনারের অতীতে করা কোন আচরন আপনার ভয়ের কারণ আর আপনাকে জেলাস করে থাকে তাহলে বিষয়টি নিয়ে তার সাথে খোলামেলা কথা বলুন। আপনি তার আচরনে কি পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন সেটি তাকে আন্তরিকভাবে বুঝান এবং এতে সৃষ্ট জেলাস বা সন্দেহের ব্যাপারেও তাকে বলুন। জেলাসী ফিল বা এই সন্দেহ যে সম্পর্ক নষ্ট করে এই ধারনা তাকে দিন।

আর যদি জেলাস ফিলের কারণ হয় আপনার ইনসিকিউরিটি বা হীনমন্যতা তাহলে আপনি দ্রুত নিজেকে সময় দিন। বুঝাই যাচ্ছে আপনি নিজেকে ভুলে গিয়ে, নিজের সম্ভাবনাকে ভুলে গিয়ে সব সময় তার কথা ভাবেন এবং নিজের বিষয়ে নেতীবাচক ধারনা লালন করেন যেমন, আমি দেখতে ভাল না, মোটেও স্মার্ট নই আমি, আমাকে কেউই পছন্দ করে না। এসব কারনে আমার পার্টনার হয়ত আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আর এই যে হারিয়ে ফেলার ভয়, এই ভয়ই আপনার জেলাস ফিল বা সন্দেহ করার কারণ।


Releted Post : কেন ভালবাসায় ঝগড়া হয়


   

২। নিজের ভিতরের শক্তি বা ইনার স্ট্রেংথ বাড়ানোঃ 

যখন একটা রিলেশনশিপ শুরু হয় তখন আসলে কি হয়? প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অন্যের কথা চিন্তা করতে করতেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটান। এতে করে ৬ মাস বা ১ বছর পর প্রেমিক প্রেমিকারা নিজের ব্যক্তিগত বা ক্যারিয়ারের দিক থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে পার্টনারের কথা ভাবতে থাকেন। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের প্রতি, নিজেদের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে নিজের সম্ভাবনা এবং আত্ম-বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। কেউ তাদের প্রসংশা করলেও তাদের গায়ে লাগে না। কেবল পার্টনারের করা কমপ্লিমেন্ট এর প্রতিই আসক্ত হয়ে যান। মূল কথা মনোযগের কেন্দ্রে থাকেন পার্টনার। আবার ছেড়ে চলে যন এই পার্টনারই।

তাই যত দ্রুত সম্ভব নিজের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, নিজের কাজ কর্মে সময় দিতে হবে, চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন ঘটিয়ে ভাল কাজে মন দিতে হবে, মেডিটেশন, অটোসাজেশনের মাধ্যমে নিজের ভিতরের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। আসতে আসতে যখন আপনার নিজের উপর আস্থা বাড়বে, তখন আপনি বুঝতে পারবেন, I can be happy with or without anybody or anything. তাই নিজের কাজের প্রতি, ডেইলি একশন গুলোর প্রতি আপনি মনোযোগ দিবেন, নিজের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাবেন। আমি তাকে ছাড়া বাঁচবনা এই জাতীয় রেডিকিউলাস চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনুন এবং নিজেকে সম্মান করুন। যারা নিজেকে সম্মান করতে পারে তারা কখনও অন্য কারো থাকা না থাকা নিয়ে বা অন্য কারো আচরনে প্রভাবিত হন না এবং মন থেকে বিশ্বাস করুন নিজের আশ্রয়স্থল নিজেকে হতে হয়। আগে নিজেকে ভালবাসতে হয়, তারপরে অন্য কাউকে।

৩। পার্টনারকে আরো ভালবাসা দিনঃ

কেউ যদি চলে যেতে চায় তাকে কখনোই জোর করে বা প্রেসারাইজ করে আটকানো যায় না, আটকাতে হয় ভালবাসা দিয়ে। যদি কোন মেয়ে বুঝতে পারে যে আপনি তাকে ভালবাসেন তাহলে সেও আপনাকে ভালবাসবে। আর আমরা যেটাকে প্রেম মনে করি সেটা আসলে প্রেম না, এটা কাম, সত্যিকারের ভালবাসায় কোন চাওয়া পাওয়া থাকে না। আমি তাকে ভালবাসি মানে আমি তার ভাল চাই, তাকে সুখী দেখতে চাই। আপনি তো তাকে ভালবাসেন, লভ করেন, তো সে অন্যকারো সাথে কথা বলে যদি শান্তি পায়, হ্যাপি হয় আপনার কি? বলুক না।

আরেকটি কথা হল- আপনার সাথে থাকার পর যদি আপনার পার্টনার অন্যকারো দিকে দৃষ্টি দেয় এর মানে হল আপনি তার লভ ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে পারেননি তাকে ভালইবাসতে পারেন নি। তাই ভালোবাসতে থাকুন, মন থেকে, দিতে থাকুন ভালবাসা তাকে। দেখবেন আপনার জেলাস ফিল দূর হয়ে সেও আপনাকে ভালবাসতে শুরু করবে।

মোদ্দা কথা হল, যদি নীতিগত ভাবে আপনার জেলাস ফিল এর কারণ যথার্থ হয়, তাহলে পার্টনারের সাথে মন খুলে কথা বলুন, তাকে বুঝিয়ে বলুন যে ভাষায় সে বুঝবে। যদি খোলামেলা কথা বলার পরও সে এই স্বভাব পরিবর্তন না করে, এমনকি এক বা একাধিক বার কথা বলার পরেও যদি সে নিজেকে পরিবর্তন না করে কখনই তার সাথে বাড়াবাড়িতে যাবেন না। সে যদি সত্যিই আপনার মানসিক সুখের কথা না ভাবে, তাহলে ভাল ভাবে সব কিছু বিশ্লেষন করুন, কোন অভিযোগ না করে, রাগারাগি না করে চুপ থাকুন, আসতে আসতে যোগাযোগ কমিয়ে দিন। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। কিন্তু নিজের সেলফ রেসপেক্ট নস্ট করবেন না।

আর যদি সমস্যা আপনার মাঝেই থাকে তাহলে নিজেকে ঠিক করুন, নিজের ভিতরের শক্তিকে জাগ্রত করুন, সন্দেহ না করে পুরোপুরি বিশ্বাস করুন- তার ব্যক্তিগত বিষয়ে, সিদ্ধান্তে হস্ত ক্ষেপ কমিয়ে দিন, ফেসবুক মেসেজ দেখা বন্ধ করুন, নিজের কাজে মন দিন- আত্মবিশ্বাস বাড়ান, নিজেকে ভালবাসুন এবং পজিটিভ থাকুন সব বিষয়ে, তাহলে আপনি জেলাস ফিল বা সন্দেহ থেকে মুক্ত হতে পারবেন।


Releted Post : মেয়েদের ভালবাসার আগে করনীয়


 

নিচে কমেন্টস বক্সে আর্টিকেল বিষয়ে মতামত দিন

শেয়ার করার মাধ্যমে আপনার বন্ধুদের এই আর্টিকেল বিষয়ে জানার সুযোগ করে দিন