কিভাবে হাঁসের খামার শুরু করবেন

হাঁস পালন বেশ লাভজনক। যদি হাঁসের খামার করার নিয়ম জেনে বা কোথাও হাঁসের খামার করার প্রশিক্ষন নিয়ে আপনি শুরু করতে পারেন তাহলে আপনার লাভ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে হাঁস প্রজননকেন্দ্র। এসব জায়গা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হাঁসের খামার দিতে পারেন। আপনি আপনার সুবিধামত জায়গা হাঁসের খামার ব্যবস্থাপনার জন্য নির্বাচন করতে পারেন। সেটি পুকুরেও হতে পারে। তবে খামার শুরুর আগে অনেক গুলো বিষয় আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। এই খামার থেকে আপনি কিভাবে ব্যবসা করতে চান সেটি আগেই চিন্তা করে নিতে হবে। তা না হলে হাঁসের খামার তৈরির পর আপনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে গেলে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।


Related Post: কিভাবে কবুতর পালন করবেন


কেউ হাঁসের হ্যাচারি করে এক দিনের, এক সপ্তাহের বাচ্চা, ২১ দিনের বাচ্চা বিক্রির মাধ্যমে হাঁসের ব্যবসা করেন, কেউ ছোট বাচ্ছা কিনে বড় হাঁসের খামার করার জন্য হাঁস পালন করেন। কেউবা ডিমের জন্য, মাংসের জন্য হাঁস পালন করেন। তাই আপনাকে আগেই স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে আপনি কিভাবে আপনার বিনিয়গকৃত অর্থ তুলবেন।

শুরুতে ১০০ হাঁস নিয়ে করতে পারেন ছোট হাঁসের খামার। পরে বুঝে শুনে খামার আসতে আসতে বড় করবেন। প্রজননের জন্য হাঁসের খামারে স্ত্রী ও পুরুষ জাতের হাসের অনুপাত হবে ১০:১। এই অনুপাত ঠিক রাখলে যারা হাঁসের হ্যাচারি করেন, বাচ্চা উৎপাদনের জন্য তারা আপনার খামার থেকে ডিম কিনে নিবে।

যদি হাঁসের খামার তৈরির জন্য আপনি ছোট বাচ্চা কিনে খামার শুরু করেন তাহলে এই ছোট বাচ্ছাদের ব্রুডিং করার নিয়মও আপনাকে জানতে হবে। কিভাবে ব্রুডিং করতে এ বিষয়ে ইউটিউবে অসংখ্য ভিডিও রয়েছে। তাই বাচ্চা কিনার পর পর আপনাকে কি করতে হবে তা জেনে শুরু করুন। ছোট বাচ্চাদের শরীরে তাপমাত্রা উৎপন্ন না হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু সময় বা দিন পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় রাখতে হবে। শীতে বেশি তাপ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট দিয়ে ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে নিতে হবে। গরমের দিনে ঘর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাঁসের থাকার জন্য এমনভাবে ঘর বানাতে হবে যেন আলো-বাতাস যাওয়া-আসা করতে পারে।

হাঁস থাকার জায়গায় ধানের তুষ অথবা কাঠের গুড়া দিয়ে বিছানা তৈরি করে নিতে হবে। ঘরের আশপাশ রাখতে হবে পরিষ্কার। ঘর অপরিষ্কার থাকলে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশংকা থাকে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আপনার আর্থক ক্ষতি কমাতে সাহায্য করবে।

হাঁসের অনেক রকম জাত আছে। তবে খামারের জন্য জিনডিং ও দেশি- এ দুই ধরনের হাঁস ভালো। এগুলো আমাদের আবহাওয়ার উপযোগী। জিনডিং হাঁস পালন পদ্ধতি খুব সহজ। এরা বছরে ২৫০ থেকে ২৭০টি ডিম দেয়। আবার দেশি জাতের হাঁসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে। এরা বছরে ২০০ থেকে ২৩০ টি ডিম দেয়। এদের মাংসও সুস্বাদু হয়। বড় কথা হল হাঁস পালনে তেমন শ্রম দিতে হয় না। বাইরে ছেড়ে দিলে নিজেরাই খাবার সংগ্রহ করতে পারে। অতিরিক্ত খাদ্য চাহিদা মেটাতে চালের কুঁড়ার সঙ্গে ডি, ই, বি-১, বি-২, বি-৬, বি-১২ ইত্যাদি ভিটামিন দেওয়া যেতে পারে।

হাঁস সাধারণত ৫ মাস বয়সে ডিম দেওয়া শুরু করে। যদি হাঁসের খামার ব্যবস্থাপনা ভাল হয়, হাঁসের খামার তৈরি করার নিয়ম ঠিক থাকে তাহলে হাঁস ৪ মাসেও ডিম দিতে পারে। ডিম দেয়া শুরু পর পূর্ণ মাত্রায় ডিম দেয় ৩ বছর বয়স পর্যন্ত। ডিমা দেয়া শেষ হলে এরপর হাঁসগুলোকে বাজারে বিক্রি করে দিতে পারেন, যার মাংস খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

প্রাথমিকভাবে ৩ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে বড় হাঁসের খামার তৈরি করতে পারেন। ১০০ হাঁসের জন্য বাঁশের একটি ঘর বানাতে এককালীন খরচ পড়বে ২০ হাজার টাকা। আপনার মাছ চাষের জন্য পুকুর থাকলে সমন্বিত খামার করতে পারেন, সমন্বিত খামারে পুকুরেই হাঁসের খামার দিতে পারবেন। ১০০ হাঁসের বাচ্চা প্রতিটি ৩৫ টাকা করে আসবে ৩৫০০টাকা। কুঁড়া মাসে এক বস্তা করে তিন বছরে ৩৬ বস্তা লগবে। প্রতি বস্তা খরচ পড়বে ২০০ টাকা করে ৩৬বস্তা ৭২০০ টাকা। বিচিং পাউডার লাগবে প্রতি মাসে ৫ কেজি। দাম কেজি প্রতি ৬০ টাকা করে মাসে ৩০০ টাকা, ৩৬ মাসে ১০৮০০ টাকা। তুষ বা কাঠের গুড়া লাগবে চার মাস পর পর চার বস্তা করে। এক বস্তা কাঠের গুঁড়ার দাম ৫০ টাকা, চার বস্তা ২০০ টাকা এভাবে ৩৬ মাসে ৯ বার কিনলে ১৮০০টাকা। ভ্যাকসিন লাগবে বছরে ১ হাজার টাকার। খারাপ সময়ের জন্য হাতে রাখতে হবে আরো ১০ হাজার টাকা। ৩ বছরে মোট খরচ হবে ৫৪,৩০০ টাকা। এছাড়া যদি বাজার থেকে হাঁসের খাবার কিনা  হয় তাহলে আরো ধরলাম- ১০২০০ টাকা। তিন বছর এই ১০০ হাঁসের পিছনে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে ৬৫০০০ টাকা।

হাঁস বছরে ডিম দেয় গড়ে ২৩০ টি। ১০০ হাঁসের ৯০ টি হাঁস ডিম দিলে বছরে ডিম পাওয়া যাবে ২০ হাজার ৭০০ টি। পাইকারি একটি ডিম ৭ টাকা টাকা দরে ২০ হাজার ৭০০ ডিমের দাম ১,৪৪,৯০০ টাকা। তিন বছর ডিম দেওয়ার পর একেকটা হাঁস গড়ে ২০০ টাকা হিসাবে ১০০ হাঁস বিক্রি করে পাওয়া যাবে ২০ হাজার টাকা। তাহলে ১,৪৪,৯০০ টাকার সাথে আরো ২০,০০০ টাকা যোগ করলে হয় ১,৬৪,৯০০ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকছে ৯৯,৯০০ টাকা।

বাংলাদেশ সরকারের কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজননকেন্দ্র আছে নারায়ণগঞ্জে। এখান থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। আরো প্রজননকেন্দ্র আছে খুলনার দৌলতপুর, নওগাঁ, ফেনীর সোনাগাজী, কিশোরগঞ্জ ও রাঙ্গামাটিতে। প্রশিক্ষণ নিতে পারেন আপনার কাছাকাছি কেন্দ্র থেকে। এসব কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করতে পারেন প্রয়োজনীয় হাঁসের বাচ্চা। হাঁসের খাবার ও ওষুধপত্র কিনতে পাওয়া যাবে প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই। ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় আছে পাখির খাদ্যের বৃহৎ বাজার। চালের মিল থেকে তুষ ও কুঁড়া সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া পশুখাদ্য দোকানে তুষ ও কুঁড়া পাওয়া যাবে।

হাঁসের প্রধান রোগ কলেরা ও পেগ। হাঁসকে এসব রোগ থেকে রক্ষা করতে কিছু নিয়ম পালন করতে হবে। ধানের তুষ দিয়ে বানানো হাঁসের বিছানায় প্রতিদিন বিচিং পাউডার এবং ভিরকন প্রয়োগ করতে হবে।

ভয় পেলে হাঁসের ডিম পাড়ায় বিঘ্ন ঘটে। তাই সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, হাঁসগুলো যেন ভয় না পায়। একদিন থেকে দুই মাস বয়সের মধ্যে দুবার পেগ ও কলেরার টিকা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাস পর পর টিকা দিতে হবে। সরকারি দপ্তর থেকে টিকার ভ্যাকসিন কেনাই ভালো।

মূল কথা হল, হাঁসের খামার দেওয়ার আগে এই বিষয়ের খুটিনাটি জেনে বুঝে শুরু করলে আপনার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।


Related Post: কিভাবে কোয়েল পাখি পালন করবেন


নিচে কমেন্টস বক্সে আর্টিকেল বিষয়ে মতামত দিন

শেয়ার করার মাধ্যমে আপনার বন্ধুদের এই আর্টিকেল বিষয়ে জানার সুযোগ করে দিন